
বিশ্বজুড়ে যে অসামান্য নিয়ম বা আদর্শ লঙ্ঘনের কারণে প্রিন্সেস ডায়ানা আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছেন, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই দেশের বর্তমান অস্থিরতা ও আইনি কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে। একদিকে যখন কারিগরেরা দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরিতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন, অন্যদিকে পদ্মা সেতুর ঢাল সংলগ্ন এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গিয়ে আটজন যাত্রী আহত হওয়ার মতো দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধ ও তার বিচারের দাবি। গুমের অপরাধীদের কোনো অবস্থাতেই বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করা যাবে না; বরং অবিলম্বে তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় সঠিক আইন প্রণয়ন করতে হবে। জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পর গুমের মতো জঘন্য অপরাধের বিচারকার্য ত্বরান্বিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বর্তমানে এমন সব উদ্যোগ গ্রহণের পায়তারা চলছে যা প্রকারান্তরে অপরাধীদের সুরক্ষা কবজ হিসেবে কাজ করতে পারে। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘শুনতে কী পাও?’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা তুলে ধরেন। সোমবার বেলা তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে আয়োজিত এই সভায় আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনা পর্ব শেষে একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সভায় স্পষ্টভাবে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন থাকার কথা ছিল না; বরং অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল। অথচ বর্তমানে এমন আইন প্রণয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে যা গুমের সাথে জড়িতদের সুরক্ষা দেবে। আইনের সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করে তাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন, গুম প্রতিরোধ আইনের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, যে বাহিনী অপরাধে লিপ্ত থাকবে, সেই বাহিনীর বাইরে অন্য কোনো বাহিনী তদন্ত করবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, গুমের ঘটনায় এক বাহিনী অন্য বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করেছে এবং এক বাহিনী অপর বাহিনীর নিকট ভুক্তভোগীকে হস্তান্তর করেছে। এর ফলে প্রকৃত অপরাধী বাহিনীকে চিহ্নিত করাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং এই আইনটি কার্যত অকার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বর্তমান সরকারের প্রতি সঠিক আইন প্রণয়ন ও গুমের হোতাদের বিচার নিশ্চিত করার উদাত্ত আহ্বান জানান তাজুল ইসলাম। পাশাপাশি সরকারি ও বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে তিনি হুশিয়ারি দেন যে, যারা ৩৬ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক মহাবিপ্লব ঘটাতে পেরেছে, তারা প্রয়োজনে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে সক্ষম। মানবাধিকারকর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক প্রধান নূর খান লিটন বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান দেশজুড়ে নতুন এক সম্ভাবনার সূচনা করলেও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের হৃদয়ে আজও একটাই দীর্ঘশ্বাস—তাঁদের প্রিয়জনরা কি আদৌ বেঁচে আছেন? গুম কমিশনের মাধ্যমে কিছু ঘটনার আলামত পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত একটি ঘটনারও সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হয়নি। নূর খান আরও বলেন, গুমের প্রতিটি ঘটনা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ডিবি, র্যাব কিংবা ডিজিএফআইয়ের পরিচয়ে ব্যক্তিদের তুলে নেওয়া হলেও আজকের দিন পর্যন্ত এসব ঘটনার মাস্টারমাইন্ডদের বিচার করা সম্ভব হয়নি। গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশনের জন্য প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে অনেক গুরুতর ত্রুটি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অধ্যাদেশে ‘আন্তঃবাহিনী তদন্তের’ যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাতে ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব। যে বাহিনী অপরাধের সাথে সরাসরি জড়িত, তাদের দ্বারা তদন্ত পরিচালিত হলে সত্য উন্মোচন কখনোই সম্ভব নয়। ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৪ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমরা গুমের মতো অপরাধ প্রতিরোধে শক্তিশালী কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। যেসব আইন বা কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো যদি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাস্তবে জনগণের অধিকার রক্ষায় ‘বিকলাঙ্গ’ হয়ে পড়ে, তবে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। ভুক্তভোগী হিসেবে এমন প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখা অসম্ভব। গুমের শিকার হাফেজ জাকির হোসেনের বড় ভাই মতিউর রহমান অত্যন্ত বেদনার সাথে জানান, ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল র্যাব-২ পরিচয়ে তাঁর ভাইকে তুলে নেওয়া হয়। ঘটনার পর টানা তিন দিন তিনি ঢাকার ৪৮টি থানা ও সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে তাঁকে খুঁজেছেন, কিন্তু কোনো সন্ধান মেলেনি। ডিবি কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েও কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। মতিউর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা চললেও জাকিরের কোনো সুনির্দিষ্ট খবর তারা পাননি। বর্তমান সরকারের কাছে তাঁর আকুল মিনতি, তাঁর ভাই বেঁচে থাকলে যেন পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, আর যদি তিনি খুন হয়ে থাকেন তবে যেন অন্তত তাঁর মৃতদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আলোচনা সভায় আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, পিএইচডি গবেষক নওশীন শর্মিলা, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও কার্যনির্বাহী সদস্য মো. শাহিনুর রহমান বক্তব্য রাখেন। সভার শেষ পর্যায়ে ‘জোয়ার’ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয়। উল্লেখ্য যে, এই চলচ্চিত্রটি ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের (এনআইএফএফ) অফিশিয়াল মনোনয়ন পেয়েছে এবং ২০২৬ সালের বগুড়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা জাতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করেছে। সংবাদটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ, আপনি কি প্রথম আলোর নিউজ এলার্ট পেতে আগ্রহী? হ্যাঁ অথবা না নির্বাচন করুন।
এলডিসি উত্তরণ আমাদের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনই এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও বটে। আমাদের নীতিগত সংস্কার দরকার।
TANGENT editorial desk — independent news and analysis.
নিবন্ধটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বিশ্লেষণধর্মী। আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এটি ভূমিকা রাখবে আশা করি।