
প্রিন্সেস ডায়ানা যে ঐতিহাসিক নিয়ম ভাঙার কারণে আজও বিশ্ববাসীর হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছেন, সেই প্রসঙ্গটির পাশাপাশি বর্তমানে দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরিতে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন নিপুণ কারিগরেরা। এদিকে, পদ্মা সেতুর ঢালে একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গিয়ে ৮ জন যাত্রী গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর বাইরে, ‘বাংলাদেশে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের জন্য রেফারেল ব্যবস্থা’ শীর্ষক একটি জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে আমন্ত্রিত বিশিষ্ট অতিথিদের সঙ্গে আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করেছেন।
সেমিনারটির একটি দৃশ্য যেখানে আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা উপস্থিত ছিলেন, যা প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ধারণ করা হয়েছে। মূলত বাংলাদেশে কর্মরত সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের আইনি সহায়তা, মনঃসামাজিক সাপোর্ট, জরুরি সাড়া প্রদান এবং ডিজিটাল নিরাপত্তাসহ নানা ধরনের সেবা বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটি হলো, এসব সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে এবং বিশেষায়িত এসব সেবার সুবিধা সারা দেশে সমানভাবে পৌঁছায় না। ফলে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা যখন কোনো বড় হুমকির মুখে বা সুরক্ষাজনিত ঝুঁকির সম্মুখীন হন, তখন তাঁরা যাতে দ্রুত ও প্রয়োজনের নিরিখে কার্যকর সহায়তা পেতে পারেন, সেজন্য একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী রেফারেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
সোমবার রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। ‘বাংলাদেশে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের জন্য রেফারেল ব্যবস্থা’ শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারটির আয়োজক ছিল প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সেমিনারের আলোচনায় ‘বাংলাদেশে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের জন্য সহায়তা সেবার ম্যাপিং এবং একটি রেফারেল ব্যবস্থা প্রস্তাব’ শীর্ষক একটি গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি একটি প্রস্তাবিত কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা তৈরির প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন কৌশলগত সুপারিশ তুলে ধরা হয়। উল্লেখ্য, ‘স্বাধীনতা: ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন ফর ডিজিটাল ডেমোক্রেসি (ফ্রিডম)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এই গবেষণা কার্যক্রম ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এবং বাস্তবায়নকারী সহযোগী হিসেবে কাজ করছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)।
গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের জন্য আইনি ও মনঃসামাজিক সহায়তা, জরুরি সাড়া ও ডিজিটাল নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা দেশে বর্তমানে বিদ্যমান। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার কারণে বিশেষায়িত সেবার প্রাপ্যতায় অসমতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে জেলা, উপজেলা এবং দুর্গম প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে এই সেবার ঘাটতি প্রকট। অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া ও তাৎক্ষণিক সাড়াদান নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
সেমিনারের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে, তাতে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এসব পরিবর্তনের সঙ্গে দায়িত্বশীলভাবে মানিয়ে নিতে হবে এবং প্রযুক্তিকে ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবর্তনের জন্য ব্যবহার করতে সক্ষম করে তোলাটাই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেপুটি হেড অব ডেলিগেশন এবং পলিটিক্যাল, ইকোনমিক, ট্রেড, প্রেস অ্যান্ড ইনফরমেশন সেকশনের প্রধান বাইবা জারিনা বলেন, কোনো সাংবাদিক বা মানবাধিকারকর্মী যখন হুমকির সম্মুখীন হন, তখন তাঁদের সহায়তা পাওয়ার জায়গা নিয়ে কোনো ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা উচিত নয়। তাঁদের জন্য বিষয়টি খুব স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে, কাকে জানাতে হবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, কোথায় সহায়তা পাওয়া যাবে এবং কী ধরনের কার্যকর সহায়তা সেখানে পাওয়া সম্ভব।
এলডিসি উত্তরণ আমাদের জন্য যেমন গৌরবের, তেমনই এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও বটে। আমাদের নীতিগত সংস্কার দরকার।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, দেশে আইন ও নীতিমালা থাকার পাশাপাশি সেগুলোর যথাযথ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে অপতথ্য ছড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং ডিজিটাল হয়রানির মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সাধারণ নাগরিকদের সচেতন করার পাশাপাশি তরুণদের এসব পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ মন্তব্য করেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যদিও মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ অনেক প্রশস্ত করেছে, তবে একই সঙ্গে তা অপতথ্য, ঘৃণা, অনলাইন হয়রানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের সুরক্ষার পাশাপাশি সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যম সাক্ষরতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
পরিশেষে, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, কেবল একটি প্ল্যাটফর্ম, নীতিমালা বা কর্মপরিকল্পনা থাকলেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না। অভিযোগের ক্ষেত্রে সময়োপযোগী আইনি ব্যবস্থা এবং দ্রুত সাড়া প্রদান নিশ্চিত করা না গেলে এর সুফল পাওয়া কঠিন হবে। প্রথম আলোর নিয়মিত নিউজ অ্যালার্ট পেতে আপনি কি আগ্রহী? হ্যাঁ বা না এর মাধ্যমে আপনার মতামত জানান।
TANGENT editorial desk — independent news and analysis.
নিবন্ধটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বিশ্লেষণধর্মী। আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এটি ভূমিকা রাখবে আশা করি।